বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১
Logo
চারিদিকে উচ্চারিত হচ্ছে ঘৃণা তবু থেমে নেই নিপীড়ন-নারীত্বের অবমাননা

চারিদিকে উচ্চারিত হচ্ছে ঘৃণা তবু থেমে নেই নিপীড়ন-নারীত্বের অবমাননা

হারুন-অর-রশীদ একের পর এক ধর্ষণের খবর যেন মহামারির মতো রোজ ছাপিয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। গোটা দেশ আজ ধর্ষণের বিরুদ্ধে একাট্টা। প্রতিদিনই উচ্চারিত প্রতিবাদ। মিছিল, সমাবেশ মানববন্ধন থেকে জানানো হচ্ছে তিরস্কার। লাখো কন্ঠে ছুড়ে দেয়া হচ্ছে ঘৃণা। দেশের শহর, গ্রাম যেখানেই চোখ রাখা হচ্ছে সবখানে ধর্ষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র আলোচনা ধর্ষণ, নিপীড়ন, নারীত্বের অবমাননা। সবার মুখে ঘৃণার বহ্নিচ্ছটা। তবুও থামছেইনা নিপীড়ন, নারীত্বের অবমাননা। যেন ধর্ষণের মহোৎসব শুরু হয়েছে। সবার মুখে মুখে যখন ঘৃনা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ তখন কারা করছে এতো এতো ধর্ষণ, নিপীড়ন? তবে ঘটনা এমন নয়তো যে ধর্ষকরাও ঘাপটি মেরে ঢুকে পড়ছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আন্দোলনে? এমন ঘটনা অবশ্য ইতিপূর্বেও এদেশে ঘটেছে। ধর্ষকরা ধর্ষণ বিরোধী মিছিলে ঢুকে ধর্ষন বিরোধী তীব্র স্লোগানে রাজপথ উত্তপ্ত করেছে। এদিকটাতে অবশ্যই সকলকে সজাগ থাকতে হবে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ কলঙ্কিত হয়েছে। এরপর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এখলাসপুর গ্রাম, তারপর লক্ষ্মীপুরের রামগতি। ক্ষোভে উত্তাল দেশ। ধর্ষণ-নিপীড়নের প্রতিবাদে রাজপথের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন পালন করছে মানববন্ধন, সমাবেশ ও গণ-অবস্থান কর্মসূচি। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে দেশের মানুষ। উচ্চারিত হচ্ছে ঘৃণা। কিন্তু তার পরও থেমে নেই নিপীড়ন, নারীত্বে অবমাননা। গণমাধ্যম তো সেই খবরই দিচ্ছে। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের এক কিশোরীকে অপহরণের পর লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ১৩ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে তার খালুর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে কিশোরীর পরিবারের লোকজন। গাজীপুরের কাশিমপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে শিশু ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার মা-ভাই এবং পাবনার চাটমোহরে গৃহবধূকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঝালকাঠিতে বিয়ের কথা বলে তরুণীকে ধর্ষণ করে, আপত্তিকর ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শেরপুরে নালিতাবাড়ীতে শিশু গৃহকর্মী ধর্ষণে অভিযুক্ত গৃহকর্তা পল্লী চিকিৎসক হারুন অর-রশীদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া এলাকায় যমজ বোনসহ তিন শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এক বাড়ির মালিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে সাভারে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গত বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড বিধান করতে এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাব তোলা হবে। দেশে বর্তমানে দন্ড বিধি ১৮৬০-এর ৩৭৬ ধারায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ নম্বর ধারায়ও ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড কথা বলা আছে। তবে এ আইনে ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের কথা বলা আছে। যদিও ভারত, ইরান, চীন, গ্রিস, রাশিয়াসহ এশিয়া-ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদন্ড, প্রকাশ্যে গুলি করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বিধান প্রচলিত আছে. ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের একেকটি ঘটনা কিছুদিন পর পর সারা দেশকে নাড়া দিয়ে গেলেও এসব ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির নজির কম। ধর্ষণের বেশির ভাগ মামলা বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় ধামাচাপা পড়ে যায়। তা ছাড়া ঠিকমতো ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়া, সামাজিক জড়তা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক ছত্রছায়সহ নানা কারণে বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। বিচারে বিলম্ব হওয়া বিচারহীনতারই শামিল। তবে আইন করলে বা প্রচলিত আইন সংশোধন করে মৃত্যুদন্ডের বিধান আনা হলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাড়াতে হবে সামাজিক অনুশাসন। আর এজন্য রাজনৈতিক অঙ্গনকে করতে হবে কলুষমুক্ত। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসকল ধর্ষক কুলাঙ্গারদের বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়া যাবেনা। বিশেষ করে গণধর্ষণগুলো ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশকে ইংগিত করে। ফলে ধর্ষকরা রাজনৈতিক সেল্টারে যেন নিজেদেরকে ক্ষমতাবান ভাবার অবকাশ না পায় সেদিকটা অবশ্যই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই নজর দিতে হবে। সর্বোপরি প্রতিটি পরিবারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তার আদরের ছেলেটি যেন কোন ক্রমেই ধর্ষক হয়ে না ওঠে। কোন ইভটিজিং করলে আমাদের সমাজের পুরুষের পাশাপাশি অনেক মা-বোনকেও বলতে শুনি ছেলেরা একটু আধটু এমন করে। এটাই ধর্ষণের হাতে খড়ি। আপনি/ আপনারা আপনার ছেলেটিকে ধর্ষক হওয়া থেকে ফেরান। তার চাল-চলন, কতবার্তা, বন্ধু বান্ধব, পরিবেশ, অপরিচিত মেয়েদের দিকে তার ইশারা ইংগিতের দিকে নজর রাখুন। এবং শুরুতেই শাসন করুন। তাহলে কোন পরিবার থেকেই ধর্ষকের জন্ম হবেনা। দেশ হবে ধর্ষকমুক্ত। নারীরা নিপীড়নের শিকার হবেনা। হবেনা নারীত্বের অবমাননা।

সংযুক্ত থাকুন