শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১
Logo
পরাধীনতার জালে সম্পর্ক যেমন হয়

পরাধীনতার জালে সম্পর্ক যেমন হয়

হৃদয় কার না ভেঙ্গেছে! হৃদয় ভাঙ্গার কোনো শব্দ হয় না। যদি হতো তবে একেকটি হৃদয় ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দে হয়তবা পৃথিবী বিদীর্ণ হয়ে যেত। কেউ বলে হৃদয় কাঁচের মত।

 

প্রিয়জনের আঘাতে নাকি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আবার কখনো শুনি- হৃদয় নাকি পাথর হয়ে গেছে। শত আঘাতেও আর ভাঙ্গে না। কাঁচের হৃদয় কী করে পাথর হয়ে যায়? হয়, হয়। কাঁচের হৃদয় পাথর হয় ভালোবাসার বিনিময়ে প্রতারিত হলে।

 

আবার পাথরের হৃদয় কাঁচের মত হয় ভালোবাসা পেলে। কী অদ্ভুত এই হৃদয়! কত রহস্য ভরা এই মনোজগত! এই হৃদয়ের অধিকারী প্রত্যেক সৃষ্টি। মানুষ সে নারী বা পুরুষ সবাই যার যার হৃদয়ের মালিক।

 

এই নারী-পুরুষ সময়ের পরিক্রমায়, জৈবিক নিয়মে, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় একসময় জীবনসঙ্গী পেতে চায়। কাছে পায়। এরপর নিজের হৃদয়ের পাশাপাশি সে তার জীবনসঙ্গীর হৃদয়ের একচ্ছত্র মালিক হতে চায়। সঙ্গী বা সঙ্গিনী যদি স্বেচ্ছায় দিতে না চায় তখনই শুরু হয় যুদ্ধ। এক মনের সাথে আরেক মনের, এক ইচ্ছার সাথে আরেক ইচ্ছার।

 

হৃদয়, অন্তর, মন, যে নামেই ডাকি না কেন! এটা কি আর বস্তু? যে চাইলো আর অমনি দিয়ে দিলাম। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তি গল্পের নায়ক অপু হৈমন্তীকে পেয়ে বলেছিলেন, আমি ইহাকে পাইলাম। সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ। কী পেয়েছিল সে? শরীর নাকি হৃদয়? হৃদয় পেয়েছিল। হৃদয় পাওয়া নিজের যোগ্যতায় বা নিজের উপার্জনের টাকায় সম্পদ কেনার মতো মূল্যবান।

 

সম্পত্তি পাওয়া হয় উত্তরাধিকার সূত্রে যাতে কোনো রকম কষ্ট করতে হয় না। এই রকম পাওয়ায় নিশ্চয়তা আছে কিন্তু আত্মতৃপ্তি নেই। ঠিক তেমনি বিয়ে করে একজন মানুষের শরীর পাওয়া মানেই একই সাথে খুব দ্রুত তার হৃদয়ও পেয়ে যাবো এমনটা নয়। এমনটি হয়ও না সহজেই। একজন মানুষ কখনো আরেকজন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয় না।

 

তাকে অর্জন করে নিতে হয়। তবেই সে সম্পদ হয়। আমাদের দম্পতিদের মধ্যে তখনই দ্বন্দ্ব বাধে যখন সে অর্জন করা ছাড়াই পাশের মানুষটিকে সম্পদ ভাবা শুরু করে। যদি হয়েও যায় সে তার সম্পদ, তার মানে এই নয় যে তাকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা যাবে বস্তুর মত। তাই কি? জীবনসঙ্গী বা সঙ্গীর মন, ভালোবাসা, যত্ন ইত্যাদি ইত্যাদি অর্জন করতে পারা যায় হয়ত।

 

তাই বলে তার ব্যক্তি সত্তাকে পারি কি? এটা একটা সহজ সত্য। যেটা আমরা মেনে নিই না। এটা মেনে নেয়া বা স্বীকার করা আমাদের জন্য চরম কঠিন হয়ে দাড়ায়। স্বামী চায় স্ত্রীকে সম্পূর্ণভাবে দখল করতে। শরীর, মন, স্বাধীনতা। আর স্ত্রীও চায় স্বামী তার একান্ত বাধ্যগত হয়ে যাক। তার কথায় উঠুক বসুক যাকে বলে আর কি (এমন চাওয়াটা বাড়াবাড়ি)। অর্থাৎ পুরো ব্যক্তির সবকিছুকে অধিকার করতে চায়।

 

এই চাওয়াটা আসলে নারী-পুরুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটা আসলে দোষেরও নয়। ভালোবাসলে আমরা সবটুকুই নিজের করে পেতে চাই। কিন্তু ব্যক্তি সত্তাকে অন্যায়ভাবে অধিকার করতে চাওয়াটা দোষের। কোনো স্বাধীন, সুশিক্ষিত মানুষ এভাবে ভাবতে পারে না বলেই আমি বিশ্বাস করি। এমন ভাবা এবং হওয়া একদমই কাম্য নয়। সম্ভবও নয়।

 

ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দিয়ে দিলেই কি সুখ আসবে? সুখী হয়ে গেলাম আমরা? এর মানে কী? ব্যক্তিসত্তা ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক প্রভাবমুক্ত অস্তিত্ব, ব্যক্তির মূল বা বিশুদ্ধ অস্তিত্ব। নিজের ভেতরের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাহিদা, চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দ, নিজস্ব মতামত, সুখ, অনুভূতি সবকিছু মিলিয়েই তো! ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো পর্যন্ত ভুলে যেতে হবে!

 

ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দেয়া মানে এই যে নয় যে, বিয়ের পর আপনি সবসময়ই স্বামী বা স্ত্রীর পছন্দেই পোশাক পরবেন, সাজবেন, বেড়াতে যাবেন বা না যাবেন। ভালোবেসে তার আবদার রাখতেই পারেন নিঃসন্দেহে। তার পছন্দকে সম্মান করতে পারেন এবং করা উচিতও। আবেগের আতিশয্যে, ভালোবাসায় গদগদ হয়ে শুরুতেই সমুদ্রে ঝাপ দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

 

সাতার না জানলে কেউই তীরে এসে পৌঁছাতে পারবেন না। নিজেদেরকে রক্ষা করাও সম্ভব নয়। ভালোবাসায় দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অতি অনুগত হয়ে দাস বা দাসী হয়ে যাওয়া চরম বোকামি। উপলব্ধি যখন হবে তখন সময় হয়ত অনেক পেরিয়ে গেছে। রাজা বা রানী যেখানে হতে পারতেন, সেখানে দাস-দাসীর মত হয়ে থাকতে হতে পারে। অথবা স্বৈরাচারী রাজা বা রানী।

 

নিজেকে ভুলে কোনো ভালোবাসাই ভালো নয়। ভালো ফল আনে না। নিজের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায়। শুরুতেই বেশি নত বা বেশী রুঢ় হলে অন্যায় করার সুযোগ তৈরি হয়। অনুগত হওয়া অবশ্যই বিশেষ গুন। কিন্তু সেই সাথে দৃঢ় থাকা খুব জরুরি। দাস বা দাসীর মত নয়, নিষ্ঠুর রাজা বা অবিবেচক রানীর মত নয়, ভালো মানুষের মত নিজেকে প্রকাশ করাই অধিকতর শ্রেয়।

 

কথায় আছে- দড়ি বেশি টাইট দিলে ছিঁড়ে যায়। আবার বেশি আলগা রাখলে প্রিয় গরুটি হারিয়ে যায়। দুজনে মিলে বিশুদ্ধ এবং সুন্দর সম্পর্ক রাখা সম্ভব। পরিশেষে একটি সত্য কথা। এখন সত্য যুগ নেই সেই আগের মত। সবাই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তবে আনফরচুনেটলি কিছু নারী-পুরুষ প্রাগতৈহাসিক যুগের হৃদয় নিয়ে জন্মে বসে আছে। তাদের শরীর-মন, সত্তা প্রস্তুত অন্যের দাস বা দাসী হওয়ার। তাদের জন্যই হয়ত এই লেখা।

সংযুক্ত থাকুন