শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১
Logo
পুলিশের নিষ্ঠুর আচরণে আমার সোনার চিকিৎসা হয়নি

পুলিশের নিষ্ঠুর আচরণে আমার সোনার চিকিৎসা হয়নি

মণিরামপুরে কলেজ ছাত্র বোরহান হত্যাকা- : মায়ের আহাজারী

আমার সোনারে ওরা চিকিৎসা না করিয়ে হাতকড়া পরিয়ে ফাঁড়িতে বসিয়ে রাখে। আমার সোনা কয়েকদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, তার চিকিৎসা চলছে।


এ কথা বলার পর পুলিশ চিকিৎসার কাগজপত্র আনার কথা বলে। দেবর ১৫ কিলোমিটার দুরে বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসাপত্র নিয়ে তাদের দেখানোর পর আমার সোনারে ছেড়ে দেয়। এতে প্রায় দুই ঘন্টা দেরি হয়ে যায়। এরপর এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেয়া হয়। ততক্ষনে সব শেষ। তার মাথার আঘাত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতেই থাকে।


পুলিশ একটু মানবিক হয়ে সাথে সাথে আমাদের কাছে আমার মানিককে ছেড়ে দিলে তার আগেভাগে চিকিৎসা করাতে পারতাম। গগনবিদারী আহাজারি করে কথাগুলো বলছিলেন মণিরামপুরে নিহত কলেজ ছাত্র বোরহান কবিরের মা রঞ্জু বেগম। ‘আমার সোনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা পূরণ হলো না। সবসময় দেশের জন্য ভাল কাজ করার কথা বলতো।


নিহত কলেজ ছাত্র বোরহান কবিরের বাড়িতে এখনো চলছে শোকের মাতম। তার মায়ের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে আছে। চিৎকার দিয়ে ছেলের কথা বলছিলেন আর মুর্ছা যাচ্ছিলেন মা রঞ্জু বেগম।

 

মায়ের কান্নায় উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। প্রতিবেশিসহ স্বজনদের শান্তনায় ছেলে হারানোর শোক চাপা দিতে পারছিলেন না মা রঞ্জু বেগম। মঙ্গলবার সরেজমিন নিহত বোরহান কবিরের বাড়িতে গেলে এসব চিত্র চোখে পড়ে।


এসময় মা রঞ্জু বেগম বিলাপ করে বলছিলেন, সোনারে পড়ানোর জন্য সেলাই সেন্টারে কাজ করেন তিনি। বাবা আহসানুল কবিরও সংসারের হাল ধরতে এবং সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে ট্রেগার চালানোর পাশাপাশি অন্য কাজও করেন।


নিহত বোরহানের নানা হামিদুল হক বলেন, তার নাতি ছেলে বোরহান মেধাবি ছাত্র ছিল। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে এ প্লাসসহ বৃত্তি লাভ করে বোরহান। এসএসসিতে ইসলাম ধর্ম ব্যতিত সব বিষয়ে প্লাস পায়। বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ভর্তি হয় মনিরামপুর সরকারি কলেজে। নিজের খরচ জোগাতে টিউশনি করতো বোরহান।


হাসপাতালে না পাঠিয়ে হাতকড়া পরিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফাঁড়িতে বসিয়ে রাখার বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। গত শনিবার ছিনতাইকারির অপবাদ দিয়ে কলেজ ছাত্র বোরহানকে বেদম পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় উপজেলার খালিয়া গ্রামে রাজগঞ্জ-হেলাঞ্চি সড়কের উপর ফেলে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাজগঞ্জ পুলিশি তদন্ত কেন্দ্রে এনে বসিয়ে রাখে।


এ খবর পেয়ে নিহতের মা রঞ্জু বেগম তার দুই দেবর নাইম ও রিকন সাথে নিয়ে পুলিশি তদন্ত কেন্দ্রে যান। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় ছেলেকে দেখে দ্রুত হাসপাতালে নিতে চাইলেও উদ্ধারকারি রাজগঞ্জ পুলিশি তদন্ত কেন্দ্রের এসআই তপন কুমার নন্দী তাদের হাতে তুলে দেয়নি। বোরহান মানসিক রোগি এবং তার চিকিৎসা চলছে বলে ছেলেকে হাসপাতালে নিতে চাইলে তপন কুমার নন্দী চিকিৎসার প্রমান চান।


এসময় বোরহানের চাচা সেখান থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বাড়িতে ফিরে গিয়ে চিকিৎসার কাগজপত্র এনে দেখানোর পর তাদের হাতে বোরহানকে তুলে দেয়।


দীর্ঘক্ষণ সেখানে অবস্থান করায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর অন্যতম কারন বলে বোরহানের স্বজনদের অভিযোগ। খালিয়া গ্রামে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শি স্থানীয় দোকানদার হাবিবুর রহমান জানান, নাইম নামের সাগরা-কৃষ্ণবাটি গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে তার মোটরসাইকেল ছিনতাই করার চেষ্টা করছে বলেই দৌড়ে লাঠি নিয়ে বোরহানকে মারপিট করতে থাকে।


নাইমের পিছু নিয়ে হাবিব সেখানে যাবার আগেই বোরহানকে মেরে রাস্তার পাশে মসুরি ক্ষেতে ফেলে রাখে। তিনি তুলতেই বোরহানকে আবার পেটান নাইম। সেখানে আরেক যুবকও বোরহানকে মারপিট করে।


এসময় নবিসন নামে এক বৃদ্ধা ঠেকাতে গেলে তাকেও পিটিয়ে আহত করে নাইম। পরে রাজগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ এসে বোরহানকে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় নাইম আটক হলেও অপর যুবক রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।


নাইমকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেরিয়ে আসবে জড়িতদের নাম দাবি নিহতের স্বজনদের। অবশ্য এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি এসআই তপন কুমার নন্দী। তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক শাহাজান জানান, বিষয়টি এসআই তপন কুমার নন্দীই ভাল বলতে পারবেন।

সংযুক্ত থাকুন