সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১
Logo
বাগেরহাটে ১৭ দিনের শিশুর হত্যাকারী মা : সাতক্ষীরায় ১৫ দিনের শিশুকে হত্যা করেছে মা-বাবা!

বাগেরহাটে ১৭ দিনের শিশুর হত্যাকারী মা : সাতক্ষীরায় ১৫ দিনের শিশুকে হত্যা করেছে মা-বাবা!

বাগেরহাটে দায় স্বীকার করে মায়ের জবানবন্দি ,সাতক্ষীরায় জন্মের পর থেকে অসুস্থ্য বোঝা মনে করে হত্যা

বাগেরহাটে ১৭ দিনের শিশুকে হত্যা করেছে বলে জবানবন্দি দিয়েছে মা। এদিকে সাক্ষীরায় ১৫ দিনের শিশু সন্তানকে হত্যা করে মা-বাবা সেপিটক ট্যাংকিতে আটকে রাখে বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার।


পৃথক এ দু’টি ঘটনায় গোটা দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাগেরহাট সংবাদদাতা সোহরাব হোসেন রতন ও মোড়েলগঞ্জ সংবাদদাতা হাসানুজ্জামান বাবু জানান, বাগেরহাটে ১৭দিন বয়সী শিশু সোহানা ঘুমন্ত বাবা-মায়ের কাছ থেকে চুরি হওয়া নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়েছে তার গর্ভধারীনী মা।


শান্তা আক্তার ওরফে পিংকি-(২২) শিশুটির মা ই নিজে হত্যা করেছে তার ১৭দিন বয়সী নবজাতক সোহানাকে। সোহানার হত্যাকারী তার বাবা, চাচা ও ফুফা কেউ নয় আদালতে স্বীকারোি মূলক জবানবন্দীতে হত্যার দায় স্বীকার করেছে মা শান্তা আক্তার পিংকি। শনিবার দুপুরে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। হ্যত্যার মূল রহস্য উদঘাটন হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

 

অন্যদিকে নিজের ছেলেকে নির্দোষ দাবি করে শিশুটির বাবা সুজনের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন মা ও বাবা। বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পঙ্কজ চন্দ্র রায় বলেন, প্রথম থেকেই আমরা সোহানা হত্যাকান্ডের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শণ, পরিবারের সাথে কথোপোকথন ও বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করি।


আমাদের ধারণা ছিল হত্যাকান্ডের সাথে পরিবারের কেউ জড়িত রয়েছে। আমরা শিশুটির বাবা সুজন খানকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ এবং রিমান্ড আবেদন করি। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে সুজনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আমাদের মনে হয় নবজাতকের মা ও বাবাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।


দুইজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শিশুটির মা আমাদের কাছে হত্যার বর্ণনা দেয়। নিজেই নিজের সন্তানকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেন। পরবর্তীতে শুক্রবার বিকেলে বাগেরহাট জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ খোকন হোসেনের সামনে শিশুটির মা শান্তা আক্তার পিংকি হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় যা আদালত রেকর্ড করেছেন।


সকল তথ্য উপাত্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে এই মামলার চুড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পঙ্কজ চন্দ্র রায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোড়েলগঞ্জ থানার ওসি তদন্ত ঠাকুর দাস বলেন, হত্যার শিকার শিশুটির বাবা সুজন ও মা শান্তা আক্তার পিংকি দুই জনেরেই আগে বিয়ে ছিল।

 

পিংকি ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার বনগঞ্জ গ্রামের মোঃ ইউনুছ শেখের মেয়ে। ২০১৭ সালে একই এলাকার উজ্জল ভুইয়া নামের এক ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়। সেখানে পিংকির একটি মেয়ে রয়েছে। কিন্তু এরই মাঝে ২০১৯ সালের দিকে পিংকির সাথে বর্তমান এই স্বামী মোড়েলগঞ্জ উপজেলার গাবতলা গ্রামের সুজন খানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক হয়।

 

প্রেমের সূত্র ধরে পিংকি তার নাম পরিচয় ও বিয়ের বিষয় গোপন করে সুজনের কাছে চলে আসেন। ২০ দিন ধরে সুজনের বোনজামাই এনামুলের ঢাকাস্থ বাসায় থেকে বিয়ের পরে সুজনের বাড়িতে আসেন পিংকি। কিন্তু পিংকি পূর্বের বিয়ে ও সন্তানের কথা এই স্বামী ও তার পরিবারের কাছে গোপন রাখেন। আমরা মামলার সূত্র ধরে পিংকির বাবার পরিবার, পিংকির পূর্বের স্বামী-সন্তান ও কয়েকজন আত্মীয়ের সাথে কথা বলেছি।

 

সুজনের পূর্বের স্ত্রী ও শান্তা আক্তার পিংকির পূর্বের স্বামীসহ বিভিন্ন পারিবারিক ঝামেলার জন্য পিংকি তার সন্তানকে হত্যা করতে পারেন এমনটি ধারণা করা হচ্ছে। পিংকি আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানিয়েছেন, তিনি রাতে ঘুমানোর পরে তার শরীরে প্রচন্ড জ্বালা শুরু হয়।

 

নিজের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বের হয়ে বাড়ির সামনের খাল, বাগান ও পুকুরের পাড়ে দৌড়াদৌড়ি করেন। এক পর্যায়ে ঘরের সামনের পুকুরের ঘাটে জামরুল (লকট) গাছের নিচে ফেলে দিয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন শান্তা আক্তার পিংকি। পরবর্তীতে রাত দেড়টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে সন্তানের জন্য কান্নাকাটি শুরু করেন শান্তা আক্তার পিংকি।


হত্যার শিকার নবজাতক সোহানার দাদা ও মামলার বাদী আলী হোসেন বলেন, আমার সন্তান সুজন খান নির্দোষ। আমি তার মুক্তি চাই। আমি নাতিও হারালাম, আবার ছেলেও জেলে এই বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। সুজনের মা নাসিমা বেগম বলেন, আমাদের আদরের ধন সোহানাকে হারিয়েছে। আমাদের চোখের পানি এখনও শুকায়নি। আমরা সুজনকে হারাতে চাই না। আমি সুজনের মুক্তি চাই।

 

এদিকে সাতক্ষীরা থেকে সংবাদদাতা হাফিজুর রহমান জানান, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাওয়ালখালীতে ‘চুরি’ হওয়ার ৩৬ ঘণ্টা পর ১৫ দিনের শিশু সোহানের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হাওয়ালখালী এলাকায় নিজ বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়।


এ ঘটনায় শিশুটির মা-বাবাকে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা মায়ের পাশ থেকে শিশুটি চুরি হয়ে গেছে বলে প্রচার করে শিশুটির মা ফাতেমা বেগম। এ ঘটনায় গত শুক্রবার সকালে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন শিশুটির বাবা সোহাগ হোসেন।

 

পরে সদর থানা পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পৃথকভাবে চুরি হওয়া শিশুটি উদ্ধারে কাজ শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় শিশুটির বাবা সোহাগ হোসেনকে। পরে তার দেয়া তথ্যে বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

 

সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের ওসি আসাদুজ্জামান জানান, হাওয়ালখালী গ্রামের সোহাগ হোসেন ও ফতেমা দম্পতি অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের ১৫ দিনের ছেলে সন্তান ঘুমিয়ে থাকা মায়ের পাশ থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে চুরি হয়ে গেছে বলে প্রচার করা হয়। ঘটনার পরপরই তদন্ত কাজ শুরু করে পুলিশ। কয়েক দফা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়।


শিশুটির বাবা-মায়ের স্বীকারোক্তি মতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর তাদের বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা-মাকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, মূলত শিশুটির বাবার চাপে মা শিশুটিকে হত্যা করে টয়লেটের ট্যাংকে ফেলে দেন। হত্যার কারণ হিসেবে তারা বলছেন- শিশুটি জন্মের পর থেকে অসুস্থ। হার্ট ও কিডনিতে সমস্যা।


শিশুটিকে রেখে বড় করতে গেলে নিজেরা অসুবিধায় পড়বেন ভেবে পরিকল্পিতভাবে দুজন মিলে তাকে হত্যা করে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও ওসি জানান।

সংযুক্ত থাকুন