বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১
Logo
বাবার কোলে ঝাপিয়ে পড়ার প্রতিক্ষায় নির্ঝর

বাবার কোলে ঝাপিয়ে পড়ার প্রতিক্ষায় নির্ঝর

করোনায় আক্রান্ত এক অসহায় পিতার একাকিত্বের গল্প ও হৃদয়ের রক্তক্ষরণ

করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এক অসহায় পিতা। চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতেই একটি নির্দিষ্ট কক্ষে আইসোলেশনে আছেন তিনি। নিস্পাপ দু’টি সন্তানকে ছুঁয়ে দেখতে পারেননা। পাননা মায়ের মমতা, বোনের ভালোবাসা। যদিও স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রিয়তম স্ত্রী স্বামীকে যথাসম্ভব সেবা দিয়ে চলেছেন। তবুও চরম একাকিত্ব আর কলিজ্বার টুকরা সন্তানদের ছুঁয়ে দেখতে না পারার ব্যাকুলতায় অসহায় এ পিতার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে।

 

একটু পর পরই খোলা দরজার অপরপ্রান্তে ছুটে আসছে তিনি বছরের ছোট্ট শিশু অরন্য দাস নির্ঝর। বাবার কোলে নিত্যদিনের মতো ঝাপিয়ে পড়তে চায় অরন্য। কিন্তু বাঁধা দিচ্ছেন মমতাময়ী মা, দাদীসহ পরিবারের সকলে। ছোট্ট শিশু নির্ঝরের আবদার, বাবাকে একটা চুমু দিয়েই ফিরে আসবে সে। আর ওপাশে সাত বছরের একমাত্র কন্যা অনুশ্রী দাস নিদ্রা বুঝতে পারে কোন এক ভয়ানক রোগে আক্রান্ত তার আরাধ্য বাবা। কাছে যাওয়ার ব্যাকুলতা আটকাতে পারেনা অনুশ্রীও। একবার জানালায়, একবার দরজার ওপাশ থেকে উঁকি মারতে থাকে সে। ইচ্ছে হয় রোজকার মতো বাবার গলা জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তির হাতে যখন গোটা পৃথিবী বন্দী। ঘাতক করোনার নিষ্ঠুর থাবায় যখন বিপর্যস্ত সব।

 

সম্পর্কের মাঝে যখন দেয়াল হয়ে দাড়িয়েছে এ ভয়ংকর মৃত্যুদূত। তখন নির্ঝরের কচি হৃদয়ের আবদার, অনুশ্রীর ব্যাকুলতা যেন শূলের মতো বিঁধে যায় মমতাময়ী মায়ের কলিজ্বায়। নিথর হয়ে যায় দাদির চোখ। আর একলা ঘরে বোবা কান্নায় ধ্বসে যায় অসহায় পিতার বুকের পাজর। পাথরের মতো শক্ত হওয়া চোয়াল, ধরা গলা আর নিরব অশ্রু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে পড়া অব্যক্ত ব্যাথার স্বাক্ষী হয় নিঃসঙ্গ ঘরের চার দেয়াল। বলছিলাম সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট অভয়নগর উপজেলা শাখার কার্যনির্বাহী সদস্য ও তীর্যক অভয়নগর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব করোনায় আক্রান্ত দেবাশীষ দাস নান্টুর কথা। করোনায় আক্রান্ত দেবাশীষ দাস নান্টু গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমনই একটি হৃদয় বিদারক ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন তার করোনাক্রান্তের পর একাকিত্বের গল্প ও হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। যা হুবহু তুলে ধরা হলো : # একাকীত্বের গল্প, দেবাশীষ দাস নান্টু রাত-৩:৫২ মিনিট। ঘুম আসছে না।

 

অন্য রাতের মত আজকের রাতটাও একই নিয়মেই কাটছে। একটা অসহ্য যন্ত্রনা। শারিরীক নয়, মানসিক। পরিবারের সবার সাথে আছি কিন্তু কাছে নেই। নিজের রুমে একা, একদমই একা। ছেলেটা ১ম দু’দিন কাছে আসার খুব চেষ্টা করেছিলো, এখন সে বুঝে গেছে কয়েকদিন বাবার আদর থেকে দুরে থাকতে হবে। তাই দুর থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে উঁকি মেরে দেখে যায়। তার মাকে বেশ কয়েকবার বলেছে বাবাকে একটা চুমু দেবো। অবশেষে আবদারটা রাখতে দুর থেকে চুমু ছুড়ে দেয়। খুব ইচ্ছে করছে ছেলেমেয়ে দুটোকে জড়িয়ে ধরতে। পারছি না। মাঝখানে “করোনা” নামক একটি অদৃশ্য দেয়াল নিষ্ঠুরভাবে বাঁধ তৈরী করেছে। আমার মাও সব বাঁধা টপকে চেষ্টা করছে আমার মাথায় তার আদরমাখা হাতটা বুলাতে। আমিই আসতে দিইনি। নীরবে মায়ের আদর থেকে নিজেকে আড়াল করে নিয়ে আছি।

 

মেয়েটা বার বার উঁকি দিয়ে যাচ্ছে, তার বাবা সুস্থ আছে তো? আমার সহধর্মিনী, যে আমার এই দু:সময়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গি। তাকেও বলেছিলাম ক’টা দিন নিজের কাজ নিজেই করবো। পারেনি। খাবার দেয়া, জল দেয়া, চা সহ করোনাক্রান্তে যতটা সহযোগিতা প্রয়োজন, সেটা করে যাচ্ছে দুরত্ব বজায় রেখে, সতর্কতার সাথে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে। দিদিও মাঝে মাঝে ওঘর থেকে সান্তনা দিচ্ছে, এখন জ্বর হলে, টেষ্ট করালেই করোনা। ভাবনার কিছু নেই ঠিক হয়ে যাবে। দিদির সান্তনা শুনে নীরবে হাসি। রুমে কাউকে আসতে দিচ্ছিনা। নিজেও বাড়ির বাইরে বের হচ্ছিনা। এটা যে আমার মত কর্মঠ এবং চঞ্চল মানুষের জন্য কতটা কষ্টের সেটা এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। মঞ্চের মানুষ, মঞ্চে থাকতে খুব ভালোবাসি। ২৬, ২৭, ২৮ তারিখ উপজেলা প্রশাসন অভয়নগর যশোর এর আয়োজনে জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো।

 

অনেকেই ফোন করে মিস করার বার্তা শোনাচ্ছেন। আমারও কলিজা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু নিরুপায় হয়ে ঘরবন্ধি থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ যশোর ও ঢাকা থেকে প্রতিদিনই আমার শারিরীক খবরসহ অন্যান্য তথ্য জানতে কল করছে। পত্রিকায় নিউজের পর অনেক প্রিয়জনেরা কল করে কুশল জানছে। এই মহামারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা যাচ্ছে, কেউ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। জানিনা আমার জন্য শেষ পর্যন্ত কোনটা অপেক্ষা করছে।

 

 

তবে সকলের উদ্দেশ্যে একবার না, বারবার বলি, সবাইকে ছেড়ে একা এভাবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পার করার কষ্টটা যে কতটা তীব্র, এটা কেউ বুঝবেন না। শারিরীক নয় মানসীক যন্ত্রনা থেকে বলছি, এ্ই রোগ যেনো বিধাতা কাউকে না দেয়। করোনাক্রান্ত হলে যেসব সমস্যাগুলো শরীরে দেখা যায়, তার কোনটিই আমার ভিতরে নেই। উপরওয়ালার অশেষ কৃপায়। শুধু মানসীক অসুস্থ ছাড়া সুস্থ আছি। একা ঘরে সারাদিন বসে শুধু অপেক্ষা, কবে আবার সবাইকে নিয়ে হাসবো আগের নিয়মে।

সংযুক্ত থাকুন