বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১
Logo
ভাঙনে ভাঙনে বদলে গেছে আশাশুনির মানচিত্র

ভাঙনে ভাঙনে বদলে গেছে আশাশুনির মানচিত্র

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার প্রধান সমস্যা হলো উপকূলীয় বাঁধ রক্ষার সমস্যা ও দীর্ঘ মেয়াদী জলাবদ্ধতা। বাঁধ ভাঙ্গন ও জলাবদ্ধতায় জর্জরিত এই এলাকার মানুষ এখন চরম বিপদে রয়েছে।


প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত মানুষ কর্মহীন ও সর্বশান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। বিপদাপন্ন মানুষদের রক্ষার জন্য সুদূর প্রসারী ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সরকারের কাছে এলাকাবাসী জোর দাবি জানিয়েছেন।


বাঁধ রক্ষা ও জলাবদ্ধতা দীর্ঘ মেয়াদী এ সমস্যার কারণে সাতক্ষীরা জেলার সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হলো আশাশুনি উপজেলা। উপজেলা ১, ২, ৪, ৬-৮ ও ৭/২ পোল্ডারের অন্তর্ভূক্ত।


উপজেলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব অংশে শ্রীউলা, আশাশুনি সদর, প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও খাজরা ইউনিয়নে বাঁধ ভাঙ্গা প্লাবনের আশংকা অত্যাধিক এবং উত্তর ও পশ্চিম অংশে তথা শোভনালী, বুধহাটা, কুল্যা, দরগাহপুর, কাদাকাটি ও বড়দল ইউনিয়নে জলাবদ্ধতার প্রকটতা বেশি।


উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষ অধিবাসী বিগত ২০-২৫ বছর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্ট সর্বনাশা জলোচ্ছ্বাসের প্লাবনে বিপর্যস্ত ও জলাবদ্ধতার তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠী এখন সর্বশান্ত ও নিঃস্ব অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।


বাস্তচ্যুতির মত ঘটনা এলাকায় ব্যাপক হারে ঘটে চলেছে। উপজেলার কিছু গ্রাম, গ্রামাংশ এবং সমতল, চাষাবাদি ও চিংড়ী ঘের সহ একটি বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে মানচিত্র পরিবর্তন ঘটিয়েছে।


এ এলাকায় ভবিষ্যতে বসবাস করা যাবে কি না এবং জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব হবে কি না ? ক্রমাগত পরিস্থিতিতে জনমনে এধরনের প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে। বিগত ষাট-এর দশকে সাতক্ষীরা এলাকায় পোল্ডার প্রযুক্তি দ্বারা নদী তীরে উপকূলীয় বাঁধ নির্মান করা হয়। এর মাধ্যমে এলাকার বিল-খাল থেকে বর্তমান চলমান নদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পোল্ডারের পূর্বে জোয়ার বাহিত পলি অবক্ষেপিত হতো বিলের মধ্যে, এখন সে পলি অবক্ষেপিত হয় নদী বক্ষে। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।


অন্যদিকে পোল্ডারের বাঁধগুলোর বয়স হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ বছর এবং দীর্ঘকাল ধরে বাঁধগুলো সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। অপরদিকে অপরিকল্পিত নোনা পানির চিংড়ী চাষ প্রভৃতি কারণে বাঁধগুলো হয়ে পড়েছে ভীষণভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, উঁচ্চ জোয়ার এবং বিশাল উজান অঞ্চলের বর্ষার পানির চাপ সহ্য করার সক্ষমতা বাঁধগুলোর আর নেই।


ফলে বাঁধ ভেঙ্গে বা উপচিয়ে এলাকা প্লাবিত হচ্ছে প্রতিবছর। বাঁধ ভাঙ্গা প্লাবন এবং জলাবদ্ধতার প্রকটতায় এলাকার প্রধান ফসল ধান ও মাছ চাষ অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে এবং বসতি এলাকা প্লাবিত হওয়ার কারণে এলাকায় বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।


আশাশুনি এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রাণদায়িনী নদী বেতনা, মরিচ্চাপ, গলঘেষিয়া ও কপোতাক্ষ নদ বর্তমানে ভরাট হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুণছে। শেষ ভরসাস্থল খোলপেটুয়া নদীও দ্রুত গতিতে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং নিচের সুন্দরবনের নদীগুলোও দ্রুত পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এসব নদীর অকাল মৃত্যুর কারণে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় বাঁধগুলোর উপর অত্যাধিক পানির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।


বিগত ১৫-২০ বছর যাবৎ উপকূলীয় বাঁধ ভাঙ্গা প্লাবন এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। সিডর, সুনামী ও আইলার মতো বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের পর ২০২০ সালের ২০ মে এলাকায় সংঘটিত হয় সুপার সাইক্লোন আম্ফান। উপজেলার ৭/২ নং পোল্ডারের হরিশখালী, চাকলা, কুড়িকাহুনিয়া, হিজলী-কোলা ও সনাতনকাটি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙ্গে প্রতাপনগর ইউনিয়ন, ৪ নং পোল্ডারের হাজরাখালী, কোলা, কলিমাখালী, থানাঘাটা, বকচর, মাড়িয়ালায় বাঁধ ভেঙে শ্রীউলা ইউনিয়ন এবং জেলেখালী ও দয়ারঘাট এলাকায় দু’টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে আশাশুনি সদর ইউনিয়ন প্লাবিত হয়।

 

বাঁধ ভেঙ্গে ইউনিয়ন ৩ টির ৮০৩৭ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ এবং ভিটে মাটি ত্যাগ করে স্থায়ী-অস্থায়ী বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে ৫৮৩ পরিবার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ৭/১, ৭/২, ৪ ও ৬-৮ পোল্ডারের অন্তর্ভূক্ত বাঁধের ১৪ টি স্থান অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় এসব স্থান ভেঙ্গে এলাকা প্লাবিত হতে পারে।


বাঁধ ভেঙ্গে পোল্ডার অভ্যন্তরের বিলের মধ্যের রাস্তা ও মৎস্য ঘেরের ভেড়ী ভেঙ্গে একাকার হয়ে গেছে, প্রতিদিন দু’বার জোয়ার-ভাটা চলার কারণে বিলের অনেক জমি খালে পরিণত হয়েছে। বিলের মধ্যে এবং বিল ধারের বসতি এলাকা প্লাবিত হয়েছে, লবণাক্ততার প্রভাবে গাছপালা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। আকষ্মিক জোয়ারের চাপে অনেক পরিবার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী সরিয়ে নিতে না পারায় অনেক গবাদি পশু পানিবন্দী হয়ে মারা গেছে।


এলাকায় কর্মসংস্থানের তীব্র অভাবে অধিকাংশ পরিবারের পুরুষ/নারী মানুষ কাজের সন্ধানে সাগরে, ইটের ভাটায় ও দূরবর্তী কোনো মৎস্য ঘেরে চলে গিয়েছে। অর্ধাহার-অনাহারে এসব পরিবারগুলো কোন রকমে দিন অতিবাহিত করছে। উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষা ছাড়া অন্যকোন ভাবেই এলাকার মানুষ ও জনপদকে রক্ষকরা সম্ভব হবে না এবং জনবান্ধব সরকারের কোন উন্নয়ন কর্মকান্ডই এই এলাকায় টেকসই ও ফলপ্রসূ করা কঠিন হবে।


এমতাবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছে এলাকাবাসীর দাবি, বিপন্ন আশাশুনি উপজেলার মানুষকে বাঁচাতে এবং এলাকার জনপদকে রক্ষা করতে আগামী ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মৌসুমের আগেই অতি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সংস্কার করার ব্যবস্থা নেওয়া, বাঁধ সংস্কার কাজে ভূক্তভোগী কর্মহীন মানুষদের শ্রমিক হিসাবে নিযুক্ত করা, জনগণ, স্থানীয় পরিষদ, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মহলকে যুক্ত করে বাঁধ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন করা এবং বাঁধ ভাঙ্গা সংক্রান্ত জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আপদকালীন তহবিল সরবরাহ করা ব্যবস্থা নেওয়া হোক।


মানচিত্র থেকে আশাশুনির কোন এলাকা পুনরায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সাথে সাথে টেকসই বাঁধ নির্মান, খাল-নদী খনন, খাল ও নদীতে অবৈধ দখল/বাঁধ/নেটাপটা অপসারণসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জোর দাবী জানান হয়েছে।

সংযুক্ত থাকুন