সোমবার, ২১ জুন ২০২১
Logo
ভৈরব নদের উপর অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণের দাবি

ভৈরব নদের উপর অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণের দাবি

ভৈরব নদ বহতা করতে অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণসহ তৃতীয় দফায় বৃদ্ধি করা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খনন কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে।


জনউদ্যোগ, যশোরের উদ্যোগে ভৈরব নদ খনন পর্যবেক্ষণ বিষয়ক এক প্রেস মিটে এ দাবি জানানো হয়। ঘোপ নওয়াপাড়া রোডস্থ জনউদ্যোগ যশোরের অস্থায়ী কার্যালয়ে সোমবার এ প্রেস মিট অনুষ্ঠিত হয়।


এতে বলা হয় ভৈরব নদের মরণাপন্ন অবস্থা থেকে রক্ষা করা এবং জলপথ সংরক্ষণ ও নদের গভীরতা বৃদ্ধি ও নদের দু’ধারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদে অবস্থিত ছোট ছোট ব্রিজ- কালভার্টের স্থলে নদীর প্রস্থ অনুযায়ী সেতু নির্মাণ এর বিকল্প নেই। প্রেস মিটে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জনউদ্যোগ যশোরের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমদ। সূচনা বক্তব্য দেন প্রবীণ সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা জনউদ্যোগ যশোরের সদস্য রুকুনউদ্দৌলাহ্। উপস্থিত ছিলেন জনউদ্যোগ যশোরের সদস্য অ্যাড. আবুল হোসেন, মাহবুবুর রহমান মজনু, সুরাইয়া শরীফ, আইডি যশোরের ব্যবস্থাপক বিথিকা সরকার প্রমুখ।


লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়- বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের সংস্কৃতি, জনসাধারণের জীবন ও জীবিকা, চলাচল ও যোগাযোগ, কৃষি ও শিল্প, মৎসজীবিকা ব্যবসা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, গঠণ, পরিবর্ধন ও বিস্তারে ভৈরব নদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এ নদ যশোরের ঐতিহ্য। যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বহতা ভৈরব নদ।


আর এ ঐতিহ্য রক্ষার্থে দাবি বাস্তবায়নে যশোরবাসী দীর্ঘদিন ভৈরব নদ সংস্কারের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। এই আন্দোলনে জনউদ্যোগ প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। জনউদ্যোগ মানববন্ধন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর লাখো মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত স্মারকলিপি পেশ করে। যশোরবাসীর লাগাতর আন্দোলনের কারণে সরকার ভৈরব নদ সংস্কারে প্রকল্প হাতে নেয়।


প্রধানমন্ত্রী এক পর্যায়ে নদটি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৭২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরু হয় পাঁচ বছর মেয়াদী ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। এ প্রকল্পের আওতায় ৯২ কিলোমিটার নদ খনন করা হচ্ছে।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী ইতোমধ্যে নদের উজান ও ভাটির ৭০ কিলোমিটারের বেশি কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। জটিলতা চলছে শহরের দড়াটানা অংশের কাজ নিয়ে। ভৈরব নদ খননের কাঠেরপুল থেকে বিরামপুর অংশের চার কিলোমিটার নিয়ে শুরু থেকেই বিপাকে পড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।


শহরের কাঠেরপুল থেকে বিরামপুর পর্যন্ত নদের মোট চার কিলোমিটার খননের গড় গভীরতা দুই দশমিক ৭৫ মিটার ও গড় প্রশস্থ হবে ৪৫ মিটার টপ টপ। এ খনন কাজ শুরুর তারিখ ছিল গত বছরের ৬ আগস্ট ও কাজ শেষ হবার তারিখ বেঁধে দেয়া হয়েছিল ২০২০ সালের ২০ জুন। কিন্তু দৃশ্যমান তেমন কোন কাজ হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পের কাজ ফের বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের (২০২১) জুন মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়।


তারপরও এ খনন কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় দফায় ভৈরব নদ খননের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত। প্রেস মিটে জনউদ্যোগ যশোরের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমদ বলেন, ‘আমরা চাই আর যেন নানান অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো না হয়।


কাজ সম্পন্নের লক্ষ্যে তদারকি জোরদার করা এবং বাকি যেসব অবৈধ স্থাপনা এখনও বিদ্যমান সেগুলোর দ্রুত অপসারণ হোক। এছাড়া তৃতীয় দফায় বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ না হলে যশোরবাসীকে নিয়ে আমাদের আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়টি ভাবতে হবে বলে তিনি জানান।


এ বিষয়ে জনউদ্যোগ যশোরের নেতৃবৃন্দ সাত মার্চ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহিদুল ইসলামের সাথে দেখা করেন ভৈরব নদ খনন কার্যক্রমের সবশেষ অবস্থা জানা এবং তাদের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে অবহিত করেন।


এদিকে জনউদ্যোগ সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে গতবছর ১২ ডিসেম্বর কালীগঞ্জের ঝনঝনিয়া থেকে যশোর সদর উপজেলার দাইতলা পযর্ন্ত নদের খনন কাজ ও নদের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় কোথাও কোথাও নদের নাব্যতা নেই। নদের গভীরতাও কম। নদের সেতুগুলো খুবই ছোট যা নদের দুপাড় বেঁধে নদের প্রস্থের তিনভাগের একভাগ সেতু নির্মাণ করছে।


যার ফলে নদের স্রোত ধারা ঠিক থাকছে না। ¯্রােত ধারা না থাকার জন্য কচুরি পানা ও ময়লা আর্বজনার স্তুপে পরিণত হয়েছে। তাই জনউদ্যোগ, যশোর মনে করে ভৈরব খনন প্রক্রিয়া পরিবেশের ক্ষতি না করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করা দরকার।


একইসাথে ভৈরব নদের অবৈধ দখল, নদীর দূষণ, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প কারখানা কর্তৃক সৃষ্ট নদী-দূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নৌ-পরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


এ বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলাম বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ৫১ট অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট চিহ্নিত করেছি। এসব ব্রিজ-কালভার্ট অপসারণ না করা হলে ভৈরব খননের যে সুফল তা শতভাগ পাওয়া যাবে না। বর্তমানে ম্যাপ অনুযায়ী নদের প্রস্থ শহরে ১৫০ মিটার এবং উপজেলায় ৩০০ মিটার রয়েছে।


কিন্তু ব্রিজ-কালভার্ট করা হয়েছে ১২ থেকে ৭০ মিটার। এতে নদীর গতিপথ যেমন কমেছে তেমনি দখল ও দূষণ চলেছে সমানতালে। যেকারণে মন্ত্রণালয়ে এগুলো ভেঙ্গে নতুন করে করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যা কনসালটেন্ট নিয়োগ করে স্টাডি পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, করোনাকালে খনন কাজে ব্যাঘাত ঘটে।


এছাড়া ভরব নদ খননকাজে অবহেলা ও সময় ক্ষেপনের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং কার্যাদেশ বাতিল করা বিষয়ক কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া ভৈরব নদ খননের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত। এ খনন কাজে নতুন করে টেন্ডারের আহ্বান করা হবে যা প্রক্রিয়াধীন।


খনন কাজ তৃতীয় দফায় বৃদ্ধি করা সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, ভৈরব নদের প্রস্থ ২৫০-৩০০ ফুট পর্যন্ত ছিল। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা ব্রিজ-কালভার্টের কারণে পলি জমে ও দখলে বর্তমানে নদের প্রস্থ স্থানভেদে ১০০-১২০ ফুট পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। যশোর শহরের অংশে আরও কমেছে ভৈরব নদের প্রস্থ। পানি প্রবাহের অভাবে নদটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

সংযুক্ত থাকুন