রবিবার, ১৩ জুন ২০২১
Logo
যশোরে নিরাপদ সবজি গ্রামে বিষমুক্ত উচ্ছে চাষ

যশোরে নিরাপদ সবজি গ্রামে বিষমুক্ত উচ্ছে চাষ

যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়ন আইপিএম মডেল ইউনিয়ন খ্যাত রাজাপুর ও কোদালিয়া মাঠে আইপিএম ক্লাবের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে বিষমুক্ত সবজি উচ্ছে। আর এই সবজি উৎপাদন করছেন উপজেলার এ ইউনিয়নে গড়ে ওঠা নিরাপদ সবজি গ্রামের কৃষকেরা।

 

সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, রাসায়নিক-বালাইনাশক ছাড়াই নিরাপদ সবজি আবাদ করে আশা জাগিয়েছেন ওই ইউনিয়নের আইপিএম ক্লাবের ২০টি গ্রুপের মাধ্যমে ৪০০ জন কিষাণ-কিষাণী। সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, চারি দিকে সবুজ আর সবুজ। যশোর সদর উপজেলা কৃষি অফিসারের পরামর্শে গ্রামের জমিতে চাষ হচ্ছে বিষমুক্ত উচ্ছেসহ নানা রকম সবজি। এরই মধ্যে জমি থেকে আলু, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন এইসব চাষ গুলো শেষ করতে না করতেই এখন বর্তমান এ মাঠ জুড়ে চাষ হচ্ছে উচ্ছে।

 

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় কৃষক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে আমরা জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক স্প্রে করতাম। এখন এভাবে আর করা লাগে না আমরা জৈব বালাইনাশক দিয়ে চাষ করি এর মাধ্যমে হাইব্রিড জাতের উচ্ছে আবাদ করেছি। এতে ফলন বেশ ভালো হত। তবে আমরা জানতাম, এসব ফসল বিষাক্ত বলে মানুষজন নানা রোগব্যাধীতে আক্রান্ত হতেন। আমরা কৃষি বিভাগের কাছ থেকে জেনেছি, রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োগে জমির ফসল বিষে পরিণত হয় এবং মাটি উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলে। আমরা গত কয়েক বছর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আর মানুষকে বিষ খাওয়াবো না। বর্তমানে আমাদের গ্রামের সবাই নিরাপদ সবজি আবাদে হাত বাড়িয়েছে। গ্রামটির প্রতিটা বাড়িতে সম্মিলিতভাবে গর্ত খুঁড়ে গৃহস্থালি বর্জ্য দিয়ে তৈরি করছেন কম্পোস্ট সার। করা হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। এছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান মিশিয়ে জৈব বালাইনাশক তৈরি করা হচ্ছে। এসব ফসলের জমিতে প্রয়োগ করে মিলছে ভালো ফলাফল। কিষাণী রুমিছা তিনি কেঁচো সার তৈরিতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। মাত্র ১৫দিনের মাথায় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করেন তিনি। এ সার জমিতে প্রয়োগ করলে অনেক ভালো ফলন মেলে বলে জানালেন তিনি।

 

আরো জানান, কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছি আমরা। ফসলের পরাগায়ন কিভাবে ঘটাতে হয় তা আমরা জানি। প্রকৃতির কাছে আশায় না থেকে পরাগায়ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। এতে ফসল পুষ্ট হচ্ছে। প্রতিটা মাঠে মাঠে জমির আ’লে মৌ বক্স ব্যবহার করছি এতে পাচ্ছি মধু আমাদের ফলনও বেশি হচ্ছে।

 

সদর কৃষি অফিসের মাহবুবুর রহমান ও জোনাব আলী সহযোগিতায় জমিগুলোতে দেখা যায়, মাঝে-মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে সেক্সফেরোমন ফাঁদ। ' এটি হচ্ছে কীটপতঙ্গ দমন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিক বক্স ব্যবহার করা হয়। যার দুপাশে তিন কোণা ফাঁক থাকে। পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করতে স্ত্রী পোকার শরীর থেকে নি:সৃত এক রকম রাসায়নিক পদার্থ বা স্ত্রী পোকার গন্ধ ব্যবহার করা হয় ফাঁদে। এর আকর্ষণে পুরুষ পোকা ফাঁদের দিকে ধেয়ে আসে এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। এতে করে জমির ফসল নিরাপদ থাকে। অতীতে এসব কীট দমনে ব্যবহার হতো বিষাক্ত কীটনাশক। সেক্সফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করায় জমির ফসল নিরাপদ থাকছে। খাদ্যমান ও পুষ্টি সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।

 

সূত্র মতে, বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে খরচ একটু বেশি হয়। তবুও ওই গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম ২বিঘা জমিতে করলা উৎপাদনে খরচ করেছেন ১৫/২০ হাজার টাকা। এ থেকে ফসল মিলেছে ৫০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। যা বাকি টাকা সব লাভ। কৃষি অফিস বলছে, নিরাপদ সবজি বাজারজাত করতে সরকার এরই মধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ঢাকায় গড়ে তোলা হয়েছে নিরাপদ কৃষি বাজার। শিগগিরই যশোর জেলায় এ ধরনের বাজার সৃষ্টি করা হবে। যাতে করে বারো মাস নিরাপদ সবজি পাওয়া যাবে।

 

এ নিয়ে কথা হয় যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন খানের সঙ্গে। তিনি প্রতিবেদককে এ তথ্যগুলো জানান, নিরাপদ কৃষি গ্রাম হচ্ছে একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। জেলার প্রতিটি উপজেলাতে এ ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রকৃতপক্ষে কৃষিকে বিষমুক্ত করতে এ উদ্যোগ। আমরা যশোরের লেবুতলা ইউনিয়ন গেলে এ বছর থেকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ওই অর্গানিক কৃষিগ্রাম গড়ে তুলেছি। এতে কৃষকের সাড়া মিলছে প্রচুর।

সংযুক্ত থাকুন